বাংলাদেশ রেলওয়ে – ইতিহাস, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ – প্রথম পর্ব

বাংলাদেশ রেলওয়ে – ইতিহাস, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ – প্রথম পর্ব

ঝক ঝক ঝক ট্রেন চলেছে

রাত দুপুরে অই।

ট্রেন চলেছে, ট্রেন চলেছে

ট্রেনের বাড়ি কই ?

শামসুর রাহমান কবিতাটি লিখলেও, আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন আসলেই ট্রেনের বাড়ি কই? কিভাবেই বা আপনার আসেপাশে এই বিরাট রেল নেটওয়ার্ক আসলো? বাংলাদেশে কিভাবে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হল? চলুন জেনে আসা যাক সে অজানা ইতিহাস !

ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯৫৩ সালে উপমহাদেশে রেল এর যাত্রা শুরু হয়। মুম্বাইয়ের বোরিবন্দর থেকে থান পর্যন্ত ৩৪ কিলোমিটার পথ ৪০০ জনকে নিয়ে পাড়ি দেয় পেনিনসুলার রেলওয়ে কোম্পানির নির্মিত প্রথম ট্রেন‌টি‌। পরের বছর অর্থাৎ ১৮৫৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া থেকে হুগলি পর্যন্ত ৩৮ কিলোমিটার রেলপথ চালু করার মাধ্যমে বাংলায় প্রথম রেলপথের সূচনা হয়। এরপর ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে ১৮৬২ সালে পশ্চিমবাংলার রাজধানী কলকাতার শিয়ালদহ থেকে রানাঘাট পর্যন্ত ব্রডগেজ রেলপথ চালু করে। শিয়ালদহ থেকে রানাঘাট পর্যন্ত যে রেলপথ চালু করা হয়েছিল, সেটাকে সেই বছরেই বর্ধিত করে বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার (সাবেক নদীয়া) জগতি পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। এদিক থেকে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের প্রথম রেলরুট দর্শনা-জগ‌তি।

দর্শনা রেলওয়ে ইয়ার্ড( collected from PIOR)

১৮৭০ সালে নর্দান বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে কলকাতা থেকে উত্তরাঞ্চলের সাথে যোগাযোগের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। পোড়াদহ থেকে শিলিগুড়ি রেল যোগাযোগের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। সেই হিসেবে ১৮৭৭ সালে আত্রাই টু জলপাইগুড়ি,১৮৭৮ সালে সারাঘাট টু আত্রাই এবং জলপাইগুড়ি টু শিলিগুড়ি মিটার গেজ লাইন বসানো হয়। ১৮৮৩ সালে পোড়াদহ টু দামুকদিয়া ঘাট পর্যন্ত ব্রডগেজ লাইন বসানো হয়। তৎকালীন বাংলার গভর্নর স্যার ইডেন এই সেকশন উদ্বোধন করেন। অপরদিকে ১৮৮২-৮৪ সালে ঢাকা স্টেট রেলওয়ে নামক একটি ছোট কোম্পানি দমদম জংশন থেকে খুলনা পর্যন্ত প্রায় ২০৪ কিলোমিটার ব্রডগেজ সেকশন চালু করে।

তাই তখন যদি আপনি কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বের হতেন তাহলে আপনাকে কলকাতা থেকে দামুকদিয়া ঘাট পর্যন্ত ১৮৫ কিলোমিটার ব্রডগেজ ট্রেনে ভ্রমন করতে হত। তারপর ফেরিতে পদ্মা পার হয়ে ৩৩৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সারাঘাট থেকে শিলিগুড়ি যেতে হত। আবার আলাদা পথে কলকাতা থেকে যশোর হয়ে খুলনা যাওয়া যেত।    

ফেরী পারাপারের যন্ত্রনা লাঘব হয় ১৯১৫ সালের ৪ই মার্চ, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ চালু করার মাধ্যমে। তারপর আস্তে আস্তে মিটার গেজ ব্রডগেজ সেকশন রুপান্তরিত হয়। দামুকদিয়া টু সান্তাহার ১৯১৫ সালে ,‌সান্তাহার টু পার্বতীপুর ১৯২৪ সালে, পার্বতীপুর টূ শিলিগুড়ি ১৯২৬ সালে ব্রডগেজে পরিবর্তন হওয়ার  মাধ্যমে দর্শনা থেকে পার্বতিপুর ব্রডগেজ ডাবল লাইন হয়ে যায় ।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারত বিভক্তির পর বেঙ্গল- আসাম রেলওয়ে পাকিস্তান এবং ভারতের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তান  উত্তরাধিকার সূত্রে পায় ২৬০৬.৫৯ কি.মি রেললাইন যা ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে (ইবিআর) নামে পরিচিত  হয় যা পরবর্তীতে পাকিস্তানি ইস্টার্ন রেলওয়ে নামকরণ হয়। ইবিআর পায় ৫০০ কিমি ব্রডগেজ ২১০০কিমি মিটারগেজ লাইন।কিন্তু ব্রডগেজ রেল ইঞ্জিন বা ব্রডগেজ রেললাইনের উপর চলাচল করার উপযুক্ত রেলযান সমূহ পূর্ব পাকিস্তানে ছিল না। তবে, পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ে সৈয়দপুরে একটি মিটারগেজ রেল কারখানা পেয়েছিল। যেখানে পরবর্তীতে ব্রডগেজ রেল ইঞ্জিন ও যানবাহন  মেরামতের সু্যোগ সৃষ্টি করা হয়।

rail rute of bangladesh

দেশভাগের পর খুলনা ও যশোর অঞ্চল পুরা রেল নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অর্থাৎ খুলনা, যশোর থেকে ডাইরেক্ট ঈশ্বরদী, রাজশাহী, চিলাহাটি যাওয়া যেত না। খুলনা, যশোর থেকে কলকাতার যোগাযোগ ছিল। উত্তর দিকে যেতে হলে বেনাপোল, রানাঘাট হয়ে যেতে হত। ১৯৪৭ সাল এর পর লাইন শুধু বেনাপোল থেকে যশোর হয়ে  খুলনা এবং উত্তর দিকে দর্শনা থেকে উত্তর দিকে।

তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান সরকার আব্দুলপুর থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত ডবল লাইনের ২য় লাইন তুলে তাড়াহুড়ো করে ৬৯.২৩ কিলোমিটার লাইন পাতে যশোর থেকে দর্শনা জংশন ক্যবিন পর্যন্ত এবং মিসিং লিঙ্ক যোগ হয়ে যায়। এই সেকশন ১৯৫১ সালের ২১ শে এপ্রিল চালু হয়।

বলতে পারেন কেন এই ডবল লাইন তুলে ফেলা হলো? ১৯৪৭ সালের পর দর্শনা দিয়ে ঈশ্বরদী – পার্বতীপুর – চিলাহাটি রেল ট্রাফিক ৭৫% কমে যায়। কারণ এটাই শিলিগুড়ি ও উত্তর বাংলার প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম ছিল। আর এই অবস্থায় একটা নতুন দেশের রেলওয়ে অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ করা বেশ খরুচে ব্যপার। অল্প খরচে তাই এই যোগাযোগ গঠন করা গিয়েছিল। আব্দুলপুর থেকে পার্বতীপুর যেতে আপনারা এখনো সহজে বুঝতে পারবেন যে এখানে ডবল লাইন ছিল। মাটির বেড, সেতুর অবশিষ্ট অবকাঠামো এখনো অবশিষ্ট র‍য়েছে।  

Meet The Amazing Writer

Nafis Siddiqui

Information and data are important assets to acquire versatile knowledge. So, Nafis Siddiqui wants every people to share knowledge, information, and data with everyone for making the world a better place with a rich and cooperative mindset.

Follow the Amazing Writer

Leave a Reply