জিন ডেইচ – “টম অ্যান্ড জেরি” পরিচালক

জিন ডেইচ – “টম অ্যান্ড জেরি” পরিচালক

আমার বয়স টা তখন এতই কম যে, কার্টুন জিনিসটা কি আমি জানিনা। কিন্তু সে দুষ্টু বিড়াল আর ছোট ইঁদুরের কর্মকাণ্ড অবাক চোখে দেখতাম। হ্যাঁ, আমি সেই পছন্দের কার্টুন ‘টম এন্ড জেরির’ কথাই বলছি। টম এন্ড জেরি দেখিনি এরকম মানুষ পাওয়া দুষ্কর। আমাদের অনেকের জীবনের প্রথম ও সবচেয়ে প্রিয় কার্টুন টম এন্ড জেরি।

এই জনপ্রিয় কার্টুনের অন্যতম পরিচালক জিন ডেইচ। যে মানুষটি আমাদের শৈশবের দিনগুলো কে সুন্দর ও আনন্দময় করে তুলেছে তার কাজের মাধ্যমে, তার সম্পর্কে জানার আগ্রহটা আমাদের কারোরই কম নয়। ব্যক্তিগত জীবনে কেমন ছিলেন এই মানুষটি? কেমন ছিল তার কর্মজীবন? অ্যানিমেশন জগতে কিভাবে তার আবির্ভাব ঘটে? চলুন জেনে নেই তার জীবনের অর্জন সম্পর্কে।

জীবনের শুরুর সময়টা :

১৯২৪ সালে শিকাগো শহরে জন্ম এই প্রতিভাবান কার্টুনিস্ট জিন ডেইচের। একটু বড় হতে না হতেই পরিবারের সঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়া শহরে স্থানান্তরিত হন। সময়টা ছিল ১৯২৯। সেখান থেকে হলিউডের স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন ডেইচ। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা বা বিভিন্ন ধরনের ইলাস্ট্রেশন করার প্রতি তার তীব্র আগ্রহ ছিল। ১৯৪২ সালে লস অ্যাঞ্জেলস উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল থেকে পাস করে নর্থ আমেরিকান অ্যাভিয়েশনে এয়ারক্রাফটের নকশাকার হিসেবে কাজ শুরু করেন। ঠিক পরের বছরই ডেইচ আবার পাইলট হবার প্রশিক্ষণ নেয়া শুরু করেন। তবে তার এই প্রশিক্ষণার্থী জীবনের মেয়াদ ছিল খুবই কম। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে এর ১৯৪৫ সালে এই প্রোগ্রাম থেকে অবসরপ্রাপ্ত হন।

ব্যক্তিগত জীবন :

ডেইচের সাথে তার প্রথম স্ত্রী ম্যারির দেখা হয় যখন, তখন তারা দু’জনই নর্থ আমেরিকান অ্যাভিয়েশনে কাজ করতেন। ১৯৪৩ সালে তারা বিয়ে করেন। পরবর্তী সময়ে তাদের তিন সন্তান কিম, সিমন এবং সেথও আন্ডারগ্রাউন্ড কমিকস এবং অলটারনেটিভ কমিকস নিয়ে কাজ করেছেন। কিমের কার্টুন চরিত্র ‘ওয়ালডো’ সবচেয়ে বেশি সমাদৃত। তবে ম্যারির সাথে সংসারজীবনের সমাপ্তি ঘটে প্রাগে যাবার পর। ১৯৫৯ সালে ম্যারিকে নিয়েই প্রাগে যান জিন ডেইচ। সেখানে কর্মক্ষেত্রে যোগদানের পর ডেইচ পরিচিত হন জেডেনকা নায়মানোভার সাথে। জেডেনকার জন্যই চেক প্রজাতন্ত্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন ডেইচ। ১৯৬৪ সালে তারা বিয়ে করেন। ৫৫ বছর একসাথে সংসার করার পর ৯৫ বছর বয়সে চিরবিদায় নিলেন এই জনপ্রিয় ইলাস্ট্রেটর।
23Deitch1-sub-videoSixteenByNineJumbo1600

কর্মজীবন কর্মজীবনের শুরুতে নর্থ আমেরিকান এভিয়েশনে নকশাকার হিসেবে কাজ করা জিন পাইলটের ট্রেনিংপ্রাপ্ত ছিলেন। তবে ১৯৪৪ সালে মেডিকেল পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে তাকে ইস্তফা দিতে হয়। আর এতেই শিল্প দুনিয়ায় তার প্রবেশ ঘটে। ১৯৫৮ সালে ‘সিডনি’স ফ্যামিলি ট্রি’ চলচ্চিত্রের জন্য অস্কারের জন্য মনোনীত হন জিন ডেইচ। ‘মানরো’ নামের একটি শর্ট ফিল্ম বানিয়েছিলেন জিন। সেটি ১৯৬০ সালে সেরা অ্যানিমেটেড শর্ট ফিল্ম ক্যাটাগরিতে অস্কার জিতে নেয়। ১৯৬৪ সালে একই ক্যাটাগরিতে ‘নাডনিক’ ও ‘হাউ টু অ্যাভয়েড ফ্রেন্ডশিপ’ ছবির জন্য অস্কারে মনোনয়ন পান তিনি। কর্মজীবনে জন ডেইচ টেরিটুনস, আন্ডার ২০ সেঞ্চুরি ফক্সের শিল্প নির্দেশক হিসেবে কাজ করেছিলেন। তার হাতেই তৈরি হয় সিডনি এলিফ্যান্ট, গ্যাস্টন লে ক্রাইওন, ক্লিন্ট ক্লোবার এবং টেরেবল থম্পসনের মতো চরিত্র।

টম এন্ড জেরি তার আগমন :

এবার আসি ‘টম অ্যান্ড জেরি’ আর ‘পাপাই দ্য সেইলর’-এর কথায়। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত টম অ্যান্ড জেরির মোট ১৩টি পর্বের পরিচালনার ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করেছিলেন ডেইচ। তিনি তার এক সাক্ষাৎকারে জানান যে, অনেকেই তার কাছে সে সময়ে চিঠি লিখে বলেছিলো ‘টম অ্যান্ড জেরি’ তাদের সবচাইতে প্রিয় কার্টুন। এই সিরিজের বয়স ৮০ বছর পরেও দর্শকদের এই মতামত এখনো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। এই কার্টুনের মতো অন্য কোনো কার্টুন এখনো তেমন দাগ কাটতে পারেনি সবার মনে।

তবে এই কিংবদন্তি কার্টুন নির্মাণের শুরুর দিকে তাকে বারবার সমালোচনার শিকার হতে হয়। অনেকে তো এটাও বলে যে, টম অ্যান্ড জেরি তার জীবনের সবচাইতে বাজে সিরিজ প্রমাণিত হবে। তবে তার কঠোর পরিশ্রম ও সৃজনশীল প্রতিভা যে এ ধরনের সমালোচনাকে ভুল প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে, তা আর নতুন করে বলার কোনো প্রয়োজন নেই। ‘পাপাই দ্য সেইলর’ কার্টুন সিরিজের কিছু পর্ব নির্মাণের কাজে সহায়তা করেন জিন ডেইচ। কিন্তু এই কার্টুন সিরিজটির মূল পরিকল্পনা তার ছিল না। ১৯৬০ থেকে ১৯৬২ সালের মাঝের সময়ে ‘টম অ্যান্ড জেরি’-এর পাশাপাশি পাপাইয়ের জন্যও কাজ করেছিলেন।

wallpaperflare.com_wallpaper

১৯৬৯ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত জিন ডেইচ ওয়েস্টন উডস স্টুডিওর জন্য অ্যানিমেশনের কাজ করেন। তিনি এই সময়ের মধ্যে ৩৭টি মুভির জন্য কাজ করেন। এর মধ্যে ‘ড্রামার হফ’, ‘ভয়েজেম’, ‘বানি প্ল্যানেট’ উল্লেখযোগ্য। টেলিভিশনের জন্য ‘দ্য ব্লাফারস’ ও ‘ক্রেজি ক্যাট’ সিরিজও তৈরি করেন ডেইচ। ২০০৮ সালে তিনি অবসর নেন। তবে তার কাজ কখনোই পুরোপুরি থেমে ছিল না। মৃত্যু অবধি লেখালেখির কাজ চালিয়ে যান ডেইচ, বিভিন্ন নতুন প্রজেক্টের দায়িত্বও নেন।

অ্যানিমেশনের জগতে দীর্ঘ সময় কাজ করার এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার দরুন ২০০৩ সালে তাকে আসিফা হলিউড থেকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়। আর ২০০৪ সালে ডেইচ ভূষিত হন উইনসর ম্যাকে অ্যাওয়ার্ডে। ডেইচ চেকোস্লোভাকিয়ায় তার জীবনযাত্রা এবং পরবর্তী সময়ে চেক প্রজাতন্ত্রে কীভাবে জীবনযাপন করেন, তা সম্পর্কে আত্মজীবনীমূলক বই ‘ফর দ্য লাভ অভ প্লেগ’-এ লিখেন। ১৯৮৯ সালে তার এই বই প্রকাশিত হয়। তার মৃত্যু এই জনপ্রিয় কার্টুনের অন্যতম পরিচালক ও অস্কারবিজয়ী ইলাস্ট্রেটর জিন ডেইচ ২০২০ সালের ১৬ এপ্রিল চিরবিদায় নেন পৃথিবী থেকে।

Meet The Amazing Writer

Sanjida Arefin Shanta

About Writer: Sanjida Arefin Shanta is an enthusiastic learner with an entrepreneurial mindset. She loves to read and wants to contribute in the society by spreading knowledge. Sanjida aims to create a positive impact by using her intellectual capabilities.

Follow the Amazing Writer

Leave a Reply