হিগস বোসন : ঈশ্বরকণার আদ্যপান্ত

হিগস বোসন : ঈশ্বরকণার আদ্যপান্ত

উপরোক্ত ছবিটিতে কি দেখতে পারছি? সৌন্দর্য-বেষ্টিত আমাদের অসীম রহস্যময় এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড?যা লক্ষ-কোটি নক্ষত্রতারা, গ্রহ,  উপগ্রহ, ছায়াপথ, সৌরজগত এর সমন্বয়। কিন্তু এমন বৃহত্তর পরিধি থেকে এখন বিষয়টির আরো গভীরে যদি পর্যবেক্ষণ করি তাহলে আমরা জানতে পারব যে প্রকৃতির সবকিছুই এমন সব ছোট ছোট কণা দিয়ে গঠিত যে এমনকি সবচেয়ে শক্তিশালী অণুবীক্ষণযন্ত্র দিয়েও তাদের দেখতে পারা সম্ভব হয়ে উঠে না। ১৮৯৬ সালে স্যার জে.জে.থমসন তেমনি এক পার্টিকেল ‘ইলেক্ট্রন’ আবিষ্কার করেন। আর দেখতে দেখতে আজকে আমরা প্রায় দুইশত এরও অধিক পার্টিকেল এর সন্ধান জানি।

উনিশ শতকের দ্বিতীয় অর্ধেকে পদার্থবিদরা পার্টিকেল ফিজিক্স কে সহজসাধ্য করার জন্য একটি মডেল দাড় করালেন, যা হলো “Standard model of particle physics”। এই মডেল পদার্থ ও শক্তির সকল ধরনের  গঠন ব্যাখ্যা করা যায়। এর সাহায্যে এই পার্টিকেল ফিজিক্স কে আরো সূক্ষ্মভাবে জানার পথ বের হয়। এই মডেল অনুযায়ী, মৌলিক পার্টিকেল প্রধানত দুই ধরনের হয়। একটি হল ফার্মিওনস পার্টিকেল যা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে উপস্থিত সব পদার্থের ভর এর জন্য দায়ী এবং আর একটি বোসন পার্টিকেল যা সব ধরনের পদার্থে বল এর জন্য দায়ী।

  • ইলেক্ট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন এই তিনটি পার্টিকেল মিলে ফার্মিওন্স গঠিত হয়। যেখানে প্রোটন ও নিউট্রন আবার কোয়ার্ক্স এর অন্তর্ভুক্ত এবং ইলেকট্রন ল্যাপটন এর অন্তর্ভুক্ত। এই সকল পার্টিকেল এর ভর থাকে, যার জন্য এরা পদার্থ তৈরীতে সক্ষম। তাই এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এর সকল পদার্থের নির্মাণ এর শ্রেয় এরাই নিবে।
  • বোসন পার্টিকেল দুই ধরনের হয়। প্রথম, গজ বোসন যা এই মহাবিশ্বে উপস্থিত চারটি মৌলিক বল এর জন্য দায়ী। দ্বিতীয়, স্কেলার বোসন যা পদার্থের ভর এর জন্য দায়ী।
  • গজ বোসন কে যদি আরো শ্রেণীবিন্যাস করা যায় তাহলে ফোটনস, গ্লুওনস, W&Z, গ্র‍্যাভিটন পাওয়া যাবে। এই চার ধরনের পার্টিকেল চার ধরনের বল উপর ক্রিয়া করে। এদের মধ্যে –
    • ফোটন তাড়িতচৌম্বকীয় বলের জন্য দায়ী।
    • W&Z পার্টিকেল এর দূর্বল নিউক্লিয় বল এর দায়ী।
    • গ্লুওনস পার্টিকেল এর সবল নিউক্লীয় বল এর জন্য দায়ী
    • গ্র‍্যাভিটন মহাবিশ্বের মহাকর্ষণ বল এর জন্য দায়ী।
  • স্কেলার বোসন মূলত হিগস বোসন যা এই মহাবিশ্বের সকল পদার্থ, সকল বস্তুর ভর প্রদান করে। এই হিগস বোসন ই আমাদের আলোচনার মূল বিষয়।
চারটি মৌলিক বলের গঠন ও বৈশিষ্ট্য

তো  হিগস বোসন কি তা জানার আগে জেনে নেওয়া যাক ভর বা mass কি?

সহজ ভাষায় ভর হল একটি পদার্থ বা পার্টিকেল এর রোধ বা বাধা যা পার করা ছাড়া ওই বস্তুকে সামনে এগিয়ে নেওয়া বা সরানো যাবে না। অনেক সময়ই আমরা ভর আর ওজন কে একি ভেবে ভুল করি। বস্তুর ওজন এর তারতম্য হলেও ভর এর কোনো তারতম্য হয়না। পৃথিবীতে আপনার ওজন যদি হয় ৬০ কেজি, তাহলে চাঁদে তা হবে ৬ ভাগের ১ ভাগ অর্থাৎ ১০ কেজি। এই তারতম্যের কারণ হল অভিকর্ষজ ত্বরণ এর ভিন্নতা। হ্যা, ভর ও অভিকর্ষ এর গুননে যা পাই তাই হল ওজন। যা ক্ষেত্রবিশেষ এ পরিবর্তিত হয়। কিন্তু ভর একই থাকে। যার মাধ্যমে বুঝা গেল, ভর একটি ধ্রুবক।

এখন, সব পদার্থ ও পার্টিকেলগুলোতে ভর আসলো কিভাবে? আপনাদের মনে হতে পারে,ভর আসলো কিভাবে? এটা আবার কেমন প্রশ্ন? ভর তো থাকেই। এটা আবার আসবে কিভাবে? এটা তো সব পদার্থে বাই ডিফল্টই থাকে। এখন ভাবুন, পানিতে জন্মগ্রহন করে পানিতেই জীবন কাটিয়ে মৃতু্বরন করা প্রাণিদের কি কখনো  মনে হবে এই জলজগত এর বাইরেও একটি জগত আছে? বা পানিতে থাকা ছাড়াও বাঁচা যায়? সেটা তো আমরা বুঝতে পারছি যে পানির ওই জীবন এই পৃথিবীর একটি অংশ কেবল। ঠিক তেমনি ভর এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আমরা কখনো  ভাবিই নি যে ভর ও কোনো কারণ বশত হতে পারে। ভর এর জন্যও কিছু দায়ী থাকতে পারে। আমরা মনে করি আমরা যেই পার্টকেল গুলো মিলিয়ে তৈরী তাদের ভর এর জন্যই আমাদের ভর। আসলেই কি তাই? না। একটা বস্তুর সবগুলোর পার্টিকেল মিলিয়ে ওই বস্তুর ভর এর ২/৩ শতাংশ ও হবে না। বিজ্ঞানীরা হিসেব কষে দেখেছেন যে একটি বস্তুর ভর শুধুই তার ভেতরের কণাগুলোর পরিমান নয়। কারণ, ভারহীন কণাও আছে প্রকৃতিতে। যেমন- ফোটন, এদের ভর নেই। তাই এদের গতি আলোর গতির সমান প্রায়। বস্তুর ভর আসে বাইরে থেকে। কিন্তু কিভাবে?

গত শতাব্দীতে একটি প্রশ্ন অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল বিজ্ঞানীদের নিকট।বস্তুর ভরের উৎস কি? উত্তর জানা ছিল না। শেষমেশ ষাটের দশকে একটা ব্যাখ্যা দাড় করলেন বিজ্ঞানীরা। বলা হলো, বস্তুর ভরের জন্য দায়ী এক ধরনের মৌলিক কণা যার নাম হিগস বোসন, জনপ্রিয় নাম গড পার্টিকেল বা ঈশ্বর কণা। একে গড পার্টিকেল বলা হয় কারণ, এটি এমনি এক কণা যাকে বিজ্ঞানী রা বহবছর যাবত খুজছিলেন। এই কণার সন্ধান অনেক গুরুত্ববাহী ছিল মহাবিশ্বের কিছু রহস্য উদঘাটনে। ১৯৬৭ সালে বিজ্ঞানী পিটার হিগস এই কণা সম্পর্কে প্রথম ধারণা দিলেও ২০১২ সালে এই হারানো টুকরা খুঁজে পাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সার্নের বিজ্ঞানীরা তাদের বিশাল ব্যয়বহুল কণা ত্বরক লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার থেকে পাওয়া প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে। লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার এক বিশাল যন্ত্রদানব। সুইজারল্যান্ড এ জেনেভার সীমান্তে জুরা পাহাড় বলে একটা জায়গা আছে, সেখানে নানা কায়দা-কসরত করে মাটির পঞ্চাশ থেকে একশ পঞ্চাশ মিটার (মানে প্রায় ১৬৫ ফুট থেকে পাঁচশ ফুট) নিচে ২৭ কিলোমিটার (মানে প্রায় সাড়ে সতের মাইল) পরিধির ধাতব এক টিউব বসানো হয়েছে। সেখানেই এই ঐতিহাসিক পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করেছেন বিজ্ঞানীরা।লার্জ হ্যাড্রন কলাইডারে সংঘর্ষের মাধ্যমে ১৪ ট্রিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্টের শক্তি উৎপন্ন হয়, আর সেই শক্তির ধাক্কায় উপ-পারমাণবিক কণিকারা (subatomic particles) দিগ্বিদিক হারিয়ে ছুটতে থাকে যত্রতত্র। সেগুলো আবার ধরা পরে যন্ত্রদানবের ডিটেক্টরগুলোতে। এভাবেই আটলাস আর সিএমএস ডিটেক্টরে ধরা পড়ল মহামান্যবর হিগসের অস্তিত্ব।

যন্ত্রদানব লার্জ হাড্রন কলাইডার

ভরের ক্ষেত্রে শুধু কণার কারসাজি তা কিন্তু নয়, আছে এর পিছনে তৈরী হওয়া ক্ষেত্রের কারিশমা। পদার্থবিদ্যায় ক্ষেত্রের ধারনা নতুন নয়। মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র, বিদ্যুৎচৌম্বকীয় ক্ষেত্র। এরপর ক্ষেত্রের ধারনা কোয়ান্টাম পর্যায়ও পরিচালনা করলেন পল ডিরাক, রিচার্ড ফাইম্যান এর মত বিজ্ঞানীরা। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার প্রতিটি কণার জন্যই আছে এমন ক্ষেত্র। হিগস ফিল্ড এমনই এক শক্তি ক্ষেত্র, যা সব বস্তুর ভর নির্ধারণ করে। বিগব্যাং এ মহাবিশ্ব সৃষ্টির পরপর যখন সব বস্তু কণিকা গুলো জন্ম নিতে শুরু করে তার আগেই তৈরী হয়েছে এই হিগস ক্ষেত্র। এই হিগস ক্ষেত্রে যেসব কণা প্রবেশ করেছে তারাই ভর লাভ করেছে। অর্থাৎ, এই ক্ষেত্রের সাথে ক্রিয়া করেই একটি কণার নিয়তি নির্ধারণ হয়ে গিয়েছে যে আসলে সেটি কতটুকু ভর লাভ করবে। বিষয়টি একটি উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাক তাহলে সহজেই বোধগম্য হবে।

কোনো এক ফাংশনে যদি একজন সাধারন মানুষ হেটে যান তবে তিনি কোনো রূপ বাধা ছাড়া সহজ ভাবে সামনে এগোতে পারবেন।অর্থাৎ তার গতি বেশি হবে আগানোর। সেই একি ফাংশন এ যদি বিজ্ঞানী হিগস হেটে যান তাহলে তাকে অনেক মানুষের প্রশ্নের,অভিবাদন এর সম্মুখীন হতে হবে। তিনি তার চলার গতিতে বাধাঁ পাবেন। অর্থাৎ, তিনি দ্রুত গতিতে সামনে এগিয়ে যেতে পারবেন না। ঠিক এই জিনিস টাই তুলনা করা হয়েছে হিগস ফিল্ডে ভর প্রাপ্তির সাথে। সেই ফাংশন টাকে ভাবুন হিগস ফিল্ড, আর মানুষ দুজন হল কণা। জন্মের পরপরই মৌলিক কণিকারা ছুটতে থাকে এই ক্ষেত্রের ভেতর দিয়ে। কিন্তু কণারা জন্মের সময় চার্জ,  স্পিন আর গতি নিয়ে এসেছে সঙ্গে করে। সে সব কণাদের যেতে হয় হিগস ক্ষেত্রের ভেতর দিয়ে। একেক জন একেক রকম বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মেছে।

হিগস ক্ষেত্রের ভেতরে একেক জন তাই একেক রকম বাধার মুখোমুখি হবে। কোনো কোনো কণার মিথস্ক্রিয়া খুব বেশি, কোনো কণার মিথস্ক্রিয়া খুব কম। যে কণা যত বেশি মিথস্ক্রিয়ায় জড়াবে হিগস ফিল্ডের সঙ্গে, তার ভর তত বেশি হবে। কোয়ার্ক কণা হিগস ফিল্ডের সঙ্গে ইলেক্ট্রনের চেয়ে অনেক বেশি মিথস্ক্রিয়ায় জড়ায়। তাই কোয়ার্কের ভর অনেক বেশি ইলেকট্রনের চেয়ে। আবার নিউট্রিনো কণার গতি অনেক বেশি, এর সঙ্গে হিগস ফিল্ডের মিথস্ক্রিয়ার হার খুব কম। তাই নিউট্রিনোর ভর খুব সামান্য। আবার আলোর কণা ফোটনের গতি অনেক বেশি, চার্জ শূন্য। তাই খুব সহজেই হিগস ফিল্ডকে ফাঁকি দিতে পারে, মিথস্ক্রিয়া না করেই বেরিয়ে যেতে পারে বিনা বাধায়। তাই ফোটনের ভর শূন্য। এই হলো প্রকৃতির ভারপ্রাপ্ত সকল বস্তুর  ভরের আসল রহস্য।

হিগস ফিল্ড এর ইলাস্ট্রেশন ; ছবিসূত্রঃ

এখন, হিগস বোসন ও হিগস ফিল্ডে এর মাঝে সম্পর্ক কি? হিগস ফিল্ডের এর যে চাঞ্চল্য সেটাই হিগস বোসন। আমরা যদি এই ফিল্ড কে সমুদ্র ভাবি তাহলে এর  তরঙ্গ বা ঢেউ কে হিগস বোসন বলা যেতে পারে। আচ্ছা এই পর্যন্ত আশা করি সবাই কিছুটা হলেও ধারনা পেয়েছি যে এই হিগস বোসনই আসলে প্রকৃতির সবকিছুর ভর এর জন্য নিযুক্ত প্রধান আসামী। কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন এটা নিয়ে এত উত্তেজনা ছিল বিজ্ঞানীমহলে। কি ই বা এমন গুরুত্ব এই কণার?

সহজ কথায়, হিগস বোসন হল মহাবিশ্বের মৌলিক রহস্য বা নিয়ম গুলো বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় শেষ উধাত্ত অংশ। বিষয়টা এমন না যে এই হিগস কণা আমাদের মহাবিশ্বের সৃষ্টি বা রহস্যের সকল কিছুর ই সমাধান করে দিবে কিন্তু হ্যা, বিজ্ঞান এর এমন কিছু থিওরি বা গাণিতিক সমস্যা মাঝপথ এ আটকে ছিল যা হিগস ক্ষেত্রের অস্তিত্বের প্রমান পাওয়া গেলে সেগুলো সমাধান হয়ে যেতো। সেই সূত্র ধরে ২০১২ সালে জুলাই মাসে শেষতক ঘোষনা দেওয়া হয় বহুল প্রতীক্ষিত হিগস ফিল্ডের প্রাপ্তি সম্পর্কে। যার জন্য বিজ্ঞানী রা নোবেল পুরষ্কার এ ভূষিত হন।

যুগান্তকারী আবিষ্কারক বিজ্ঞানী পিটার হিগস

তথ্যসূত্রে – 

    • Wikipedia
    • https://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/12416
    • https://roar.m.edia/bangla/main/science/how-higgs-boson-particle-was-discovered

ছবিসূত্রে – 

    • Google

Meet The Amazing Writer

Amrita Agarwal

About Writer: Hi! I am Amrita. I am quite passionate in writing on science and technology. I believe that uncovering the mystery of universe we can reach the highest peak of progress..so knowing this broadly should be our first aim!

Follow the Amazing Writer

Leave a Reply