হাজিয়া সোফিয়া – আশ্চর্য ভবন

হাজিয়া সোফিয়া – আশ্চর্য ভবন

হাজিয়া সোফিয়া বর্তমান তুর্কিতে অবস্থিত প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শন। হাজিয়া সোফিয়া বাইজেন্টাইন ও অটোম্যান সাম্রাজ্যের জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এক ভবন। হাজিয়া সোফিয়াকে তুর্কিতে আয়া সোফিয়া বলা হয়ে থাকে।

হাজিয়া সোফিয়া বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সময় তৈরি হয়। কনস্ট্যানটাইন-১ বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠক। সে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং ৩৩০ খ্রিস্টাব্দে নিজের নাম অনুসারে বর্তমান তুর্কির নাম রাখেন কনস্টান্টিনোপল। তুর্কি এশিয়া এবং ইউরোপ দুই মহাদেশের মধ্যে অবস্থিত।তাই পরবর্তীতে বর্তমান তুর্কির মাহাত্ম্য বৃদ্ধি পায়।৫৩৭ খ্রিস্টাব্দে জাস্টিনিয়ান-১ বর্তমান হাজিয়া সোফিয়া তৈরির সিদ্ধান্ত নয়। এর আগেও হাজিয়া সোফিয়া তৈরি করা হয়। কিন্তু তখন কেবল কাঠের তৈরি ভবন নির্মাণ করা হয়।রাজা আর্কাদিওসের আমলে ৪০৪ খ্রিস্টাব্দে রাজনৈতিক দন্দ্বের কারণে হাজিয়া সোফিয়া কে পুড়িয়ে ফেলা হয়। পরবর্তীতে রাজা থিওডোসিয়াস-২ হাজিয়া সোফিয়া কে পুনঃসংস্কার করে কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত নিকা বিদ্রোহের  সময় এটি আবার পুড়িয়ে ফেলা হয়।বলে রাখা ভাল নিকা বিদ্রোহ রাজা জাস্টিনিয়ান-১ এর বিরুদ্ধে করা আন্দোলন।

ছবিসূত্রঃ বাইজেন্টাইন সময়ের হাজিয়া সোফিয়া

জাস্টিনিয়ান-১ এবার পাকা হাজিয়া সোফিয়া তৈরি করার জন্য স্থাপত্যের কাজে ইসোডোরোস এবং এন্থিমিওস কে নিয়োগ দেয়।এরা মূলত  গণিতবিদ ছিল যারা রাজার মন মোতাবেক স্থাপত্য তৈরিতে সক্ষম হয়েছিল। রাজা চাচ্ছিল তার দরবার হল  বিশালাকৃতির হবে  তাই তারা  ভেতরে  বিশাল জায়গা রাখার জন্য  এক বৃহৎ আকৃতির  গোলাকার গম্বুজ  তৈরি করে এবং এই গম্বুজ কে  টিকিয়ে রাখার জন্য পেন্ডেনটিডস পদ্ধতি  ব্যবহার করে। পেন্ডেনটিডস পদ্ধতি  এক বৈপ্লবিক নির্মাণ পদ্ধতি হয়ে দাঁড়ায় ।এর মাধ্যমে  গোলাকার গম্বুজের সম্পূর্ণ ঘর  চারটি পেন্ডেনটিডস বহন করে। ফলশ্রুতিতে  মধ্যখানে  বিশাল বিশাল স্তম্ভ  তৈরি  ছাড়াই  হাজিয়া সোফিয়া  তৈরি  করা সম্ভব হয়েছিল।প্রায় ৬ বছর এবং ১০০০০ মানুষের মাধ্যমে ৫৩৭ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান হাজিয়া সোফিয়ার গঠন হয়। হাজিয়া সোফিয়া  দৈর্ঘ্যে ২৬৯ ফুঁট  এবং প্রস্থ ২৪০ ফুট। গোলাকার গম্বুজটি মেঝের মোজাইক থেকে প্রায় ১৮০ ফুট উপরে। পরবর্তীতে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের জন্য হাজিয়া সোফিয়া রাজ্য অভিষেক ভবন হিসাবে ব্যবহৃত হতে থাকে। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বড় বড় রাজারা এখানে মুকুট পড়ে রাজ্য অভিষেক করত।

হাজিয়া সোফিয়ার মেঝেতে এবং ছাদে ব্যবহৃত মার্বেল পাথর সিরিয়া থেকে আনা হয় উত্তর আফ্রিকা থেকে।ভবনটির প্রবেশের মোজাইক এর মধ্যে মাদার মেরির সাথে কনস্ট্যানটাইন ১ এবং জাস্টিন ১ কে দেখা যায়। এখানে কনস্ট্যানটাইন-১ কনস্টান্টিনোপল মাদার মেরি কে উপস্থাপন করেন এবং জাস্টিন-১ হাজিয়া সোফিয়া উপস্থাপন করেন।হাজিয়া সোফিয়া এরকম আরো অনেক ধরনের চিত্রকর্ম দৃশ্য তৈরি করা হয় যা বাইবেল কেন্দ্রিক।

ছবিসূত্রঃহাজিয়া সোফিয়ার প্রবেশদ্বারের চিত্রকর্ম
ছবিসূত্রঃ হাজিয়া সোফিয়ার ভিতরের মেহরাব

১৪০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে যখন বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য দুর্বল হতে থাকে। তখন অটোম্যান সাম্রাজ্য সারা দুনিয়ায় আধিপত্য সৃষ্টি করতে থাকে।১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে মাহমু্দ-২ ২১ বছর বয়সে কনস্টান্টিনোপল জয় করে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতন ঘটায়।মাহমুদ-২ কনস্টান্টিনোপল এর নামকরণ করেন ইস্তানবুল।

অটোম্যানদের ক্ষমতার পর হাজিয়া সোফিয়ার কিছু পরিবর্তন আনা হয়।হাজিয়া সোফিয়ার চারপাশে চারটি মিনার তৈরি করা হয়।মূল গম্বুজে যীশুর চিত্র মুছে ফেলে সোনা দিয়ে তৈরি আরবি হস্তলিপি খচিত করা হয়।মক্কার দিকে মুখ করা মেহরাব তৈরি করা হয়।তারা আটটি বৃহৎ মেডেল কলামের মধ্যে আটকায় যার মধ্যে আল্লাহ,তার রাসূল,ইসলামের চার খলিফা এবং হাসান হোসেনের নাম খচিত থাকে।

ছবিসূত্রঃ হাজিয়া সোফিয়ার বর্তমান রুপ

বর্তমান যুগের গগনচুম্বী স্থাপত্যকারিদের জন্য হাজিয়া সোফিয়া এক আশ্চর্য নাম।হাজিয়া সোফিয়া অনেক ভূমিকম্পের ও যুদ্ধের সাক্ষী তা সত্ত্বেও ১৫০০ বছর ধরে ভবনটি টিকে আছে। হাজিয়া সোফিয়ার পাথর থেকে শুরু করে এর গম্বুজ টিকে থাকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।এর পাথর প্রচন্ড ক্ষয়প্রাপ্ত। বিভিন্ন পরীক্ষা দাড়াও এটি প্রমাণ হয়েছে যে এর উপাদান গুলো  অত্যন্ত দুর্বল। ভবনের গম্বুজটির নিম্নাংশ ভবনটিকে স্পর্শ করা ছাড়াই ভবনকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। অনেকে মনে করে হাজিয়া সোফিয়া দৈবিক শক্তি দ্বারা টিকে আছে।ভবনটির ব্যাপারে একটি পুরনো গল্প আছে। একটা বালক ভবন নির্মাণের কর্মীদের মাঝে কাজ করছিল।কাজ করার সময় কর্মীরা এক সমস্যার সম্মুখীন হয়। সমস্যার সমাধানের জন্য তারা বাইরে বের হয়।এসময় বালকটিকে যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে দিয়ে যায়। এমন সময় ছেলের সামনে এক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটে এবং তাকে সমস্যার সমাধান জানায়।বালকটিকে সমাধান নিয়ে কর্মীদের কাছে যেতে বলে এবং বালকটিকে লোকটি এই বলেও অভয় দেয় যে সে যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ করবে। ছেলেটি যখন কর্মীদের কাছে সমস্যার সমাধানটি জানায় তখন তারা বুঝতে পারে সমাধানকৃত ব্যক্তি কোনো সাধারণ মানুষ নয় বরং এক ফেরেশতা। তাই তারা বালকটিকে দূরে পাঠিয়ে দেয় এবং সেখানে ফিরতে নিষেধ করে দেয়। ধারণা করা হয় সেই বালকের অপেক্ষায় ফেরশতাটি এখনো হাজিয়া সোফিয়াকে পাহাড়া দিয়ে যাচ্ছে।

অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ১৯৩৫ সালে মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক হাজিয়া সোফিয়াকে জাদুঘর করার সিদ্ধান্ত নেয়।  

ছবিসূত্রঃমোস্তফা কামাল আতাতুর্ক

মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক তুর্কি রাষ্ট্রের জনক।তুর্কি জনগণ তাকে খুবই সম্মান ও শ্রদ্ধার নজরে দেখে। তার সব সিদ্ধান্তকে এখনো তারা সমীহ করে চলে। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো হাজিয়া সোফিয়াকে বিশ্ব ঐতিহ্য বলে ঘোষণা দেয়। এটি শিক্ষা ও ভ্রমণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছে।

বর্তমানে ভবনকে কেন্দ্র করে অনেক বাক বিতণ্ডা শুরু হয়েছে। তুর্কি সরকার তাইয়েপ এর্দোগান হাজিয়া সোফিয়াকে মসজিদ হিসেবে পরিবর্তন করার চিন্তা করছে। এতে সারা বিশ্বব্যাপি মুসলিম এবং খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের মাঝে রেষারেষি শুরু হয়।তুর্কির বিরোধী দলের দাবী এর্দোগান রাজনৈতিক সংকটের সময় হাজিয়া সোফিয়াকে মসজিদ বানানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এতে সে তুর্কির রক্ষণশীল মুসলিমদের সমর্থন পায়। তাদের মতে মক্কা ও মসজিদুল আকসার পর হাজিয়া সোফিয়া তৃতীয় পবিত্র জায়গা। একই সাথে তারা এটাকেও যুক্তি হিসেবে টেনে আনে যে মসজিদ হওয়ার পর এটাকে বন্ধ করা মোটেও উচিত নয়। গ্রিসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে। তারা হাজিয়া সোফিয়াকে নিজেদের উত্তরাধিকার হিসেবে দাবি করে কেননা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে গ্রিক ভাষা ব্যবহৃত হত এবং একই সাথে তারাও খ্রিষ্টান ছিল।

অনেকদিন ধরে তুর্কির কোর্টে মসজিদ করা নিয়ে সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকার পর অবশেষে মসজিদ করার পক্ষে সিদ্ধান্ত আসে। এতে তুর্কিসহ বহির্বিশ্বে মানুষদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তুর্কির অনেকে  এতে নামায পড়তে পারবে বলে আনন্দ প্রকাশ করে।সেই সাথে হাজার বছরের ঐতিহ্য নষ্ট করা হচ্ছে বলে মতামত প্রকাশ করে অনেকে। পোপ ফ্রান্সিস এই সিদ্ধান্তে অনেক দুঃখ প্রকাশ করে। তবে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এর্দোগান অভয় দেয় হাজিয়া সোফিয়া আগের মতই সকল ধর্মের মানুষের প্রবেশের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে। তুর্কির সময় অনুযায়ী ২৩ জুলাই হাজিয়া সোফিয়ায় মুসলিমদের জুম্মার নামায আদায়ের মধ্য দিয়ে ৮৬ বছর পর মসজিদ হিসেবে এটি আবার যাত্রা শুরু করে। 

Meet The Amazing Writer

Mushfiqul Afridi

About Writer: Human always work for their creation. Every human being should get acknowledged with their potential. This kind of vision has assisted Mushfiq to built Potrolipi where thousands of people will be able to recognize their accomplishment as well as gather a lot of information.

Follow the Amazing Writer

This Post Has One Comment

  1. Anonymous

    Thanks for giving us these valuable information. Hope that you guys will publish more interesting stories and valuable information and will make a nice platform for new writers and dreamers. Good luck guys. You are doing a great job.

Leave a Reply