ট্যাংক সমরের সফলতম যোদ্ধা – Kurt Knispel

ট্যাংক সমরের সফলতম যোদ্ধা – Kurt Knispel

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানীর সাফল্যের পিছনে Otto Carius, Micheal Wittmann, Erwin Rommel এর মতো নামগুলোর অনেকটা আড়ালেই ঢাকা পরে যায় একটি নাম Kurt Knispel যাকে বলা হয়ে থাকে মডার্ণ আরমর্ড ওয়ারফেয়ারের সবচেয়ে সফল যোদ্ধা। নামের পাশে রেকর্ডেড ১৬৮ ট্যাংক ধ্বংসের কৃতিত্ব থাকার পরও তাহলে কেনো পেলেন না Knight’s Cross? কেনই বা থেকে গেলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে?

জন্ম ও বেড়ে ওঠা :

ট্যাংক ওয়ারফেয়ারের এই মহারথীর জন্ম ১৯২১ সালে Sudetenland এর Salisfeld নামের ছোট এক শহরে যা বর্তমানে Czech Republic এর অন্তর্গত। তার পিতা একটি গাড়ি নির্মানপ্রতিষ্ঠানে কাজ করতো এবং তরুণ বয়স থেকেই Knispel ও অটোমোবিল কারখানায় কাজ করা শুরু করে। ধারণা করা হয় সেখান থেকেই তার মধ্যে মেকানাইজড মেশিন ও গাড়ির প্রতি ভালোবাসা জন্মায়।

ছোটবেলাকার Knispel ; ছবিসূত্র : Petelawrieblog.com

আর্মিতে যোগদান ও ট্রেনিং :

১৯৪০ এ Knispel মাত্র ১৯ বছর বয়সেই Wehrmacht এর পদাতিক বাহিনীতে যোগদান করে। বেসিক আর্মি ট্রেনিং এর পর সেখানে প্রথম কয়েক মাসেই Panzer I, II, IV ট্যাংকগুলোর ওপর আরমরড ওয়ারফেয়ারের বেসিক ট্রেনিং সম্পন্ন করে। ১লা অক্টোবর তাকে 12th Panzer ডিভিশনের 29th রেজিমেন্টের 3rd কম্পানি তে বদলি করা হয়। সেখানে সে গানার এবং লোডার হিসেবে শর্ট ব্যারেল Panzer IV তে ট্রেনিং নেয় এবং পারদর্শী হয়ে ওঠে।  ১৯৪১ এর ১১ই জুন তার ট্রেনিং সম্পন্ন হয়। 

সহযোদ্ধার সাথে Knispel ; ছবিসূত্র : Pinterest.com

যুদ্ধযাত্রা :

২২শে জুন, ১৯৪১ জার্মানী নন-এগ্রেশন প্যাক্ট ভঙ্গ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে অপারেশন বারবারোসা নামে। Lt. hellman এর কমান্ডকৃত Panzer IV ট্যাংকে করে Knispel ও তা ইউনিট সোভিয়েত আক্রমণে প্রবেশ করে এবং প্রথম দিনই Knispel ফার্স্ট কিল বা প্রথম সৈনিক হত্যার মাধ্যমে তার সৈনিক জীবনের সূচনা করে। মাত্র কয়েকদিনের ব্যাবধানেই তাদের অগ্রগামী ডিভিশন বেলারুসের মিন্সক শহরে পৌছে যায়। Knispel বেশীদিন নিজের ট্যাংকে অবস্থান করতে পারেনি কারণ জুন মাসেই তীব্র ক্ষয়ক্ষতির কারণে তাদের ট্যাংক ব্যাবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে এবং জুলাই তেই তাদের ট্যাংক পরিবর্তন করতে হয়। ২০শে জুলাই Knispel ও তার পুরো ইউনিটকে লেনিনগ্রাদ আক্রমণে পাঠানো হয়। 

লেনিনগ্রাদ যাত্রার মাত্র ৫ দিনের মাথায়ই তার ট্যাংক কলামের লিডে থাকা অবস্থায় আক্রান্ত হয়। অন্য ক্রুরা ঝাপিয়ে বের হয়ে গেলেও Knispel বিচক্ষণতার সাথে পেরিস্কোপ দিয়ে ট্যাংকটি আবিষ্কার করে এবং ধ্বংস করে। একেই ধরা হয়ে থাকে তার প্রথম ট্যাংক কিল।

Tiger-I ট্যাংকে Knispel ; ছবিসূত্র : Rf-hobby.cz

১৯৪২ এর জানুয়ারি তে Knispel Putlos এ ফিরে আসে নতুন Tiger ট্যাংকের উপর ট্রেনিং নিতে। তখন তার নামের সাথে যুক্ত হয়েছে আরো ১১ টি ট্যাংক কিল। ট্রেনিং এর পর Knispel ও তার গ্রুপকে 500th ট্যাংক ব্যাটেলিয়নে পাঠানো হয় যা পরে 503rd হেভি ব্যাটেলিয়নের 1st কম্পানি নামে অংশ নেয় বিখ্যাত “Battle of Kursk” এ। Kursk ক্যাম্পেইনে Knispel আরো ২৭ টি ট্যাংক কিল অর্জন করে নেয়। 

১৯৪৪ সালের শুরুর দিকে সোভিয়েত আর্মি, জার্মান সাউথ আর্মি গ্রুপের ছয়টি ডিভিশনকে (প্রায় ৫৬,০০০ সৈন্য, ৩০ ট্যাংক, ২০০+ আর্টিলারি গান) ইউক্রেনের Korsun শহরে বলয়াকারে ঘিরে ফেলে যা Cherkassy Pocket নামে খ্যাত। Knispel ও তার ব্যাটেলিয়ন কে পাঠানো হয় এই বলয়ভেদ করে সৈন্যদের মুক্ত করার জন্য। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরও জার্মান আর্মি এখানে আংশিক সফলতা অর্জন করে। এরপর Vinnitsa, Jampol, ও Kamenets-Podolsk অঞ্চলগুলোতে বিভিন্ন মিশনে Kurt অংশগ্রহণ করে এবং তার ট্যাংক কিলের লিস্ট বড় হতে থাকে। এরই মাঝে সে ৫০তম কিলের পর Iron Cross (First Class) এবং ১০০টি ট্যাংক ব্যাটেলের পর Tank Assault Badge অর্জন করে নেয়। 

D-day বা ৬ জুন, ১৯৪৪ তে মিত্রপক্ষের Normandy ল্যান্ডিং এর ঠিক আগমুহূর্তেই Knispel ও তার ইউনিট জার্মানি ফিরে আসে। সেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল সফল Tiger I এর নতুন সংস্করণ Tiger-II যাকে বলা হয়ে থাকে King Tiger। এই নতুন হেভি 

Tiger-II ট্যাংকের কমান্ডে Knispel ; ছবিসূত্র : Rf-hobby.cz

ট্যাংক দিয়ে ব্যাটেলিয়নকে Normandy পাঠানো হয় মিত্রপক্ষকে প্রতিহত করার জন্য। কিন্তু যুদ্ধে জার্মানির পরিস্থিতি দিনদিন খারাপ হতে থাকলে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। আগস্টের শেষদিকেই তাদের ব্যাটেলিয়ন জার্মানি ফিরে যায় এবং পুনর্বিন্যস্ত হয়। অক্টোবরে তাদের ইউনিট কে পুনরায় সোভিয়েত আর্মির অগ্রগতি প্রতিরোধে ইস্টার্ণ ফ্রণ্টে পাঠানো হয়। সেখানে সে Mezőtúr, Törökszentmiklós, Cegléd, Kecskemét, Gyula, Nitra শহরগুলোতে যুদ্ধে লিপ্ত হয় ও একের পর এক ট্যাংক ধ্বংস করে নিজেকে নিয়ে যায় এক অনন্য উচ্চতায়। 

মৃত্যু :

Knispel সুন্দর সময় দেখে যেতে পারেনি। বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র ১০ দিন আগে, ১৯৪৫ সালের ২৮শে এপ্রিল Austria এর Strondorf শহরের কাছেই সোভিয়েত ট্যাংক শেলের আঘাতে তার ট্যাংকের বারুদ বিস্ফোরিত হয় এবং শার্পনেলের আঘাতে Knispel মাথায় গুরুতর আঘাত পায়। এরমাত্র দুই ঘন্টা পরেই এক অস্থায়ী আর্মি হাসপাতালে এই অকুতোভয় যোদ্ধা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। মৃত্যুর ৬৮ বছরের মাথায় ২০১৩ সালের ১০ এপ্রিল, Czech কর্তৃপক্ষ তাদের Vrbovec শহরের একটি চার্চ ওয়ালের পিছে ১৫ জন

এই ডগ ট্যাগ দেখেই সনাক্ত করা হয় Knispel কে ; ছবিসূত্র : Vchistorica.blogspot.com

জার্মান সৈনিকের সাথে তার সমাধি সনাক্ত করতে সক্ষম হয়। ২০১৪ সালের ১২ নভেম্বর জার্মান ওয়ার গ্রেভস কমিশন তার দেহাবশেষ Brno এর কেন্দ্রীয় মিলিটারি সমাধিস্থলে সমাহিত করা হয়। 

চিরনিদ্রায় শায়িত Kurt Knispel; ছবিসূত্র : Facebook.com

অর্জন ও কৃতিত্ব :

বস্তুত Knispel জার্মান প্রায় প্রতিটি ট্যাংকেই লোডার, গানার এবং সবশেষে কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধে অংশ নেয়। Knispel একবার এক সোভিয়েত T-34 ট্যাংককে প্রায় ৩০০০ মিটার দূর থেকে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। 

১২৬তম ট্যাংক কিলের পর Kurt Gold Cross ব্যাজ অর্জন করে নেয়। ৪ বার থার্ড রাইখের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি  Knight’s Cross এর জন্য মনোনীত হয়েও সেই ব্যাজ কখনোই পাওয়া হয়ে ওঠেনি Knispel এর। তবে একমাত্র নন-কমিশনড অফিসার হিসেবে Wehrmacht Communique এ তার নাম উল্লিখিত হয়। নামের পাশে ১৬৮ ট্যাংক কিল থাকা সত্ত্বেও, বারংবার ট্যাংক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে সফল 

Völkischer Beobachter পত্রিকায় ১০৭ ট্যাংক কিলের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত Knispel; ছবিসূত্র : En.topwar.ru

হওয়ার পরও Michael Wittman বা Otto Carius এর মতো পরিচিত মুখ না হওয়া কিংবা Knight’s Cross না পাওয়ার পিছনে ইতিহাসবিদরা কিছু কারণকে বিশ্লেষণ করে থাকেন। অনেক ইতিহাসবিদ তার নাৎসি প্রপাগাণ্ডা কর্মকান্ডে অংশ না নেওয়া কে এর প্রধান কারণ হিসেবে মনে করেন । এছাড়াও তার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে ঝামেলাকেও এক কারণ মনে করা হয়। এমনই এক ঘটনাকে দায়ী করা হয় যখন Knispel এক সোভিয়েত বন্দিকে লাঞ্চনাকারী জার্মান অফিসারকে বাধা দিলে সে তাদের রোষের মুখে পড়ে। মূলত এই কারণেই ধারনা করা হয় প্রতিভা অনুযায়ী তার পদোন্নতি হয়েছিল খুবই ধীরে। এছাড়াও অনেক ইতিহাসবিদের মতে শুধুমাত্র ট্যাংক ধ্বংসের সংখ্যার উপর নয় পাশাপাশি রণকৌশলে অসামান্য অবদানের জন্য এই সম্মাননা দেয়া হয়ে থাকে আর Knispel শুধুমাত্র ট্যাংকই ধ্বংস করেছে, এরকম অসামান্য অবদান তার কোনো নেই। আবার অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন তার কিল সংখ্যা গণনা পদ্ধতিতে কোনো গড়মিল রয়েছে।

সহযোদ্ধাদের সাথে সদা হাস্যজ্জল কার্ট; ছবিসূত্র : PetelawrIeblog.com

সহযোদ্ধাদের কাছে Knispel ছিল খুবই অমায়িক ও খ্যাতিবিমুখ একজন মানুষ। শোনা যায় অনেক সময় অনেক কিলের ক্রেডিট সে সহযোদ্ধাদের দিয়ে দিত। সে হিসাব করলে হয়তো তার কিল দাঁড়াবে ২০০ এর কাছাকাছি। তবে এ তথ্যের সত্যতা যাচাই করা যায়নি। তবে অসামান্য অবদান থাক বা না থাক Knispel তার প্রতিভা ও একাগ্রতা দিয়ে নিজেকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। এজন্য Kurt Knispel উচ্চারিত হলে সাথেই চলে আসবে “Most Successful Tank Shooter of the Second World War “।  

      তথ্যসূত্রে – 

      • “Panzer Aces II: Battle Stories of German Tank Commanders in World War II” – by Franz Kurowski
      • Wikipedia
      • Military.wikia.org
      • Petelawrieblog.com
      • Volksbund.de

Meet The Amazing Writer

Anindya Basak

About Writer: Modern tech has made human life much easier and hustle-free. As a tech enthusiast, Anindya wants to develop human-machine interaction that ensures efficient, secure, and widespread transfer of information and knowledge to the mass people.

Follow the Amazing Writer

Leave a Reply